দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন। বিপরীতে বিক্রি করেছেন প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার। ফলে এ সময়ে তাদের নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা।
সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে মোট ১৬ কার্যদিবস ছিল। এর মধ্যে ১৩ কার্যদিবসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার পরিমাণ বিক্রির চেয়ে বেশি ছিল। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে শেয়ার কেনার এ প্রবণতা দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিএসইর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের মে মাসে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন মাত্র ৭৩ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নেমে এসেছিল। এরপর জুনে তা বেড়ে প্রায় ৫৪০ কোটি এবং জুলাইয়ে প্রায় ৫২৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। আগস্টে মোট লেনদেন কমে প্রায় ৩১৮ কোটি টাকায় নেমে আসে। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া কয়েকটি নীতিগত উদ্যোগ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য লেনদেন ও বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ করেছে।
এসব উদ্যোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার। পাশাপাশি ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি ও বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ দিতে নতুন বিধিমালার খসড়া তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। মার্জিন ঋণসংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সূচক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমএসসিআই বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া আবার চালুর ঘোষণা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশের সূচকের নিয়মিত পর্যালোচনা শুরু হবে। ২০২৩ সালে ফ্লোর প্রাইসসংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাংলাদেশকে ‘বিশেষ নজরদারিতে’ রাখা হয়েছিল। নিয়মিত পর্যালোচনায় ফিরে আসার বিষয়টিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশ থেকে বিনিয়োগের অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে শেয়ার বিক্রির অর্থ বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হতো। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই সীমা বাড়িয়ে ১০০ কোটি টাকা করেছে।
এ ছাড়া প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠানের সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলো সরাসরি কর কেটে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ বিদেশে পাঠাতে পারছে। এতে অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রশাসনিক জটিলতা ও সময় কমেছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত প্রায় ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৩২টি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ারধারণ রয়েছে।
বিদেশি শেয়ারধারণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রায় ৩৫ শতাংশ শেয়ার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। এরপর অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ারধারণ ২৫ শতাংশের বেশি। এ ছাড়া বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও রেনাটা লিমিটেডেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে।
সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের (এনআরবি) নামে খোলা বিও হিসাবের সংখ্যা ৪১ হাজার ৯৩৭টি।
বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কেনার এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের পুঁজিবাজারে তারল্য ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ অনেকটাই নির্ভর করবে বাজারের নীতিগত পরিবেশ, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মৌলভিত্তি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
