রিজার্ভ চুরি মামলায় ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ সিআইডির


বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলায় খসড়া অভিযোগপত্রে নাম থাকা বাংলাদেশি ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তদন্ত শেষ করে শিগগিরই অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার আশা করছে সংস্থাটি।


বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আলী আকবর খান গণমাধ্যমকে বলেন, মামলাটির তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা নেওয়ায় তদন্তে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং খুব বেশি দেরি না করেই অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হবে।


অভিযোগপত্রে নাম থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগপত্র দাখিলের পর প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, খসড়া অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের নয় কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগপত্রে দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থতার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।



তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মামলায় দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশি অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, মেজবাউল হক ও আবুল কাসেমসহ আরও কয়েকজনের নাম রয়েছে।


তদন্ত সূত্রের ভাষ্য, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে সংরক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে হ্যাকাররা এ অর্থ সরিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে সিআইডি।



তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার দিন সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফিশিং লিংক থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতির তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার পর বিষয়টি জানার পরও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়েছিল।


তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্তে দেখা গেছে বাংলাদেশের এই ১০ জন অভিযুক্ত আসামি এ ঘটনায় তাদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং দায়িত্ব অবলা প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তারা অজানা কারণে ঘটনার দিনে সুইফ সিস্টেমের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করেনি। ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে তারা হ্যাকারদের পাঠানো ফিশিং লিংকে ক্লিক করে সেটা ওপেন রেখে ব্যাংক থেকে বের হয়ে চলে যায়। তারা সিস্টেমের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বের হয়ে চলে যান। ফলে হ্যাকাররা ঐ লিংক ব্যবহার করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি জানতে পারলেও পরে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। উল্টো তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার নানা প্রচেষ্টা চালায়। এছাড়া তদন্তে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তাদের আরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।



সিআইডি সূত্র আরও জানায়, গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়।


গত ১ এপ্রিল দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, জাপানের ১, ভারতের ৪ এবং বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।


উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই অর্থ সরিয়ে নেয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা, অর্থপাচারের পথ ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত কার্যক্রম চালানো হয়।

Previous Post Next Post

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন