জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্য পদত্যাগ করেছেন। এরপরেই গণমাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে একটা খোলা চিঠি পাঠানো হয়েছে। এতে বিদায়ী কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর পাশাপাশি সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলত, বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে প্রণীত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ পুনরায় চালু হলো।
এদিকে, খোলাচিঠিতে এই অধ্যাদেশ বাতিলে নতুন সরকারের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন– “এখন আমাদের কী হবে?” তাদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।’
বলা হয়, আমরা পাঁচজন সদ্যবিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দরুন, ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের দৈনন্দিন প্রতিকূলতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতার সাথে আমরা সুপরিচিত। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।
চিঠির তিনটি অংশ: সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তি চিহ্নিতকরণ, এবং ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা।
সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব
অধ্যাদেশগুলো বাতিলের পক্ষে যুক্তি হিসেবে সংসদে বেশ কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে; নিচে সঠিক তথ্য দেওয়া হল। তবে শুরুতেই স্পষ্ট করা দরকার যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ হল প্রিন্সিপাল আইন; এর ওপরই দাঁড়িয়ে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ। সুতরাং নিম্নোক্ত আলোচনা অঙ্গাঙ্গিভাবে-যুক্ত এই তিনটি অধ্যাদেশ নিয়েই।
১। সংসদে বলা হয়েছে; গুমের সাজা মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার।
বাস্তবে: গুম অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রাভেদে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন সহ যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, এবং জরিমানা (ধারা ৪(১)-(২))।
২। সংসদে বলা হয়েছে: অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নেই; জরিমানা নির্ধারণের ও আদায়ের উপায় নেই।
বাস্তবে; মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা স্পষ্ট বেঁধে দেওয়া আছে (ধারা ১৬(১) (ঙ)-(চ)) এবং জরিমানা নির্ধারণ ও আদায়ের পদ্ধতি বিস্তারিত আছে (ধারা ২৩)। এমনকি সময়মতো তদন্ত রিপোর্ট দাখিল না করলে গুম অধ্যাদেশে শাস্তির বিধানও আছে (ধারা ৮(৫))।
বরং সংসদ কর্তৃক পুনর্বহালকৃত ২০০৯-এর মানবাধিকার কমিশন আইনে এগুলো কিছুই নেই।
৩। সংসদে বলা হয়েছে: আইসিটি আইন যথেষ্ট। মানবাধিকার কমিশন এবং গুম অধ্যাদেশ "বালখিল্যতা" মাত্র। শুম অধ্যাদেশ আইসিটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
বাস্তবে: আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার করতে পারে, ফৌজদারি অপরাধ নয় (ধারা ৩(২)(এ))। কোনো অপরাধ মানবতাবিরোধী হিসেবে গণ্য হতে হলে তা ব্যাপক/পদ্ধতিগত হতে হয়, অনেকটা হত্যা আর গণহত্যার পার্থক্যের মতো। তাই আইসিটি 'বিচ্ছিন্ন' গুমের বিচার করতে পারে না, শুধু 'গণহারে' গুমের বিচার করতে পারে। সংসদে বলা হচ্ছে আইনে এ বিষয়ে "এমবিগুইটি" আছে, যা
সঠিক নয়। শুম অধ্যাদেশও বলে যে ব্যাপক/পদ্ধতিগত গুমের বিচার আইসিটির এখতিয়ারাধীন (ধারা ২৮)। সংসদে বলা হয়েছে দুটো আইন "ম্যাচিং" করার উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে। যেহেতু 'বিচ্ছিন্ন গুম' আর 'গণহারে গুম' ভিন্ন অপরাধ, আইন "ম্যাচিং" করার কোনো অবকাশ নেই।
এদিকে সংসদ কর্তৃক অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ার কারণে, ১১ এপ্রিল থেকে কোনো নতুন গুম হলে সেটি ফৌজদারি আইনেও সংজ্ঞায়িত নয় এবং আইসিটিতে গেলেও ভুক্তভোগীরা কোনো প্রতিকার পাবেন না।
৪। সংসদে বলা হয়েছে: অধ্যাদেশ পাসের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবে: জুলাই অধ্যাদেশ অনুযায়ী, অভ্যুত্থানকালে রাজনৈতিক প্রতিরোধের কারণে মৃত্যু হলে, জুলাই যোদ্ধারা সুরক্ষিত থাকবেন; তবে বিশৃঙ্খলার সুযোগে সংঘটিত হত্যা হলে, মামলা হবে (ধারা ৫)। স্বার্থের দ্বন্দ্ব এড়াতে, কোন মৃত্যু কোন শ্রেণিতে পড়বে তা মানবাধিকার কমিশন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। কিন্তু পুনর্বহালকৃত ২০০৯ আইনে, মানবাধিকার কমিশন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না (ধারা ১৮)। তদন্ত করবে সেই সরকারি বাহিনীগুলোই, যারা জুলাইয়ে নিজেরাই সরাসরি পক্ষ ছিল। যে তরুণ রাস্তায় নেমেছিলেন, তাঁর ভাগ্য নির্ধারণ করবেন তিনিই, যাঁর বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে ভবিষ্যতে সব রাজনৈতিক দলের জুলাই যোদ্ধারাই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
৫। সংসদে বলা হয়েছে: কমিশন তদন্ত করে আবার নিজেই বাদী হয়ে মামলা করা পক্ষপাতমূলক।
বাস্তবে: কোনো অভিযোগ আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রতীয়মান হলে, কমিশনের মামলা করার সুযোগ আছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব কেবল তখনই হতো, যদি কমিশন সেই মামলায় বিচারকের ভূমিকাও পালন করত, যা অধ্যাদেশে নেই। তদন্তকারী পুলিশও নিয়মিত বাদী হয়ে মামলা করে, কেউ সেটাকে পক্ষপাতমূলক বলে না।
৬। সংসদে বলা হয়েছে: ২০০৯/২০২৫ উভয় আইনেই কমিশন স্বায়ত্তশাসিত, তাই দুটিই সমান শক্তিশালী।
