অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপরাধী যেই দলেরই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা-প্রধানমন্ত্রীর এমন কড়া বার্তা দলের বিভিন্ন পর্যায়েও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি দলের তৃণমূলও নড়েচড়ে বসেছে। জনপ্রতিনিধিসহ নেতারা কঠোর অবস্থানে। সম্প্রতি এর প্রতিফলন দেখা গেছে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন, মাগুরা, চাঁদপুর ও বরিশালে। যেখানে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার, একই সঙ্গে বিএনপি দলগতভাবে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে তা প্রশংসনীয়। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জনগণ তা এখন বাস্তবে দেখছে। এটি ভালো দিক।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোরজবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’
সূত্রমতে, প্রশাসনকেও বলা হয়েছে সরকারি দল বলতে কোনো কথা নেই। কেউ অপরাধ করলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রেফতারের পর কেউ তদবির করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
রোববার পুলিশের সদ্য বিদায়ি মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল বৈঠক হয়। সেখানে তিনি বলেন, চাঁদাবাজি, বেআইনি কর্মকাণ্ড ও মবসহ বিশৃঙ্খল বিভিন্ন তৎপরতায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হবে না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা আইন মেনে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করবেন। ওই বৈঠকে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার যুক্ত ছিলেন। এ সময় অপরাধ দমনে পুলিশকে আরও কঠোর হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি গণমানুষের দল। জনগণের সেবায় কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে তা সহ্য করা হবে না। জনগণ ভালোবেসে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছে, তাই জনগণের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। সেই অঙ্গীকার নিয়েই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কাজ শুরু করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেড়িবাঁধে থাকা ১২টি মেহগনি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ ওঠে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলমের (জাহাঙ্গীর) বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় ওই নেতার প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হয়। মঙ্গলবার দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলমের বিরুদ্ধে কামালপুর এলাকায় বেড়িবাঁধের মেহগনি গাছ ব্যক্তিগত স্বার্থে কেটে ফেলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তিনি গাড়ি নিয়ে তার বাড়ি যাওয়ার পথ সুগম করতে এ ধরনের অন্যায় ও নিন্দনীয় কাজ করেছেন, যা দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং এ ধরনের গর্হিত কাজের জন্য পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পর্যায়ের পদ স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। বুধবার সন্ধ্যায় জেলা শহরে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
এছাড়াও ঈদ উপলক্ষ্যে ভিজিএফ চালের কার্ড বণ্টনকে কেন্দ্র করে মাগুরা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বুধবার এই সংঘর্ষে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি শেখ তরিকুল ইসলামসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলায় ইতোমধ্যে ১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেঙ্গারচর পৌরসভায় হাটবাজার ইজারার টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির দুগ্রুপে সংঘর্ষের ঘটনায় বিএনপির চার কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এর আগে বরিশালে আদালতের এজলাসে ঢুকে হট্টগোল, বেঞ্চে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমানকে (লিংকন) আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বিএনপি নেতারা জানান, এই চার ঘটনাসহ আরও বেশকিছু ঘটনায় ইতোমধ্যে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সারা দেশের নেতাকর্মীদের বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে-যে কোনো ধরনের অপকর্মের বিরুদ্ধে বিএনপি জিরো টলারেন্স নীতি দেখাবে।
এদিকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিসহ যে কোনো অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় যাচ্ছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যরা। সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মানিকগঞ্জ জেলার সব দপ্তর ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সেখানে তিনি বলেন, সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি নির্মূল করতে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজ এবং বালু উত্তোলনকারী আমার দলের নেতাকর্মী এবং আমার নিজের সন্তান হলেও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি সরকারি দল। সরকারে থেকেও নিজ দলের নেতাকর্মীরা কোনো অপরাধ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি। এমন নজির আগে কখনো দেখা যায়নি। যা আইনের শাসনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘটনা দেখে মনে হচ্ছে, একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের যে প্রত্যাশা তা পূরণেরই দিকেই হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
