কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর কৌশল আইএমএফকে জানালো এনবিআর


তলানিতে থাকা কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনা ও কৌশল সম্পর্কে জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে বৈঠক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধি দল। বৈঠকে এনবিআর জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং বকেয়া রাজস্ব আদায় জোরদারের মাধ্যমে আগামী কয়েক বছরে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।


মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।


সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে আগারগাঁওয়ে এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান আহসান হাবিব, সংস্থাটির সদস্য, প্রথম ও দ্বিতীয় সচিবরা অংশ নেন। আইএমএফের বাংলাদেশ মিশন প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল বৈঠকে অংশ নেয়। আলোচনায় নতুন বাজেট, রাজস্ব ঘাটতি, রাজস্ব নীতি ও সংস্কার, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো এবং অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের বিষয় গুরুত্ব পায়।


বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ও সুদানের সামান্য ওপরে। গত জুনে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।


অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯’-এ ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।


জানা গেছে, নতুন ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পাঁচ দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। এর অংশ হিসেবে সোমবার দিনব্যাপী চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আহরণের কৌশল সম্পর্কে ধারণা নেয় সংস্থাটি।আরও পড়ুন


বৈঠকে এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে করহার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত করজাল বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় করছাড় ছাড়া নতুন কোনো কর অব্যাহতি দেওয়া হয়নি।


তাদের ভাষ্য, ব্যবসাবান্ধব বাজেটের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো হলে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আদালতে আটকে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলেও বৈঠকে জানানো হয়।


আইএমএফ প্রতিনিধি দল এনবিআরের উপস্থাপিত পরিকল্পনা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা বিষয়গুলো নোট করে নিয়েছে এবং পরবর্তী বৈঠকে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।


আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ৩ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আদায় হয় ৩ লাখ ৩১ হাজার ৫০২ কোটি টাকা।


২০২৩-২৪ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত করার শর্ত দিয়েছিল আইএমএফ। এ জন্য প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব প্রয়োজন হলেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।


পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ৭৩ হাজার কোটির বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও পূরণ করতে পারেনি এনবিআর।

সবশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৯ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা কমে প্রায় ৮ শতাংশে নেমে আসে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিবর্তে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়।


এমন প্রেক্ষাপটে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে আইএমএফ। বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা ও আগামীতে আদায়ের কৌশল জানতে চায় আইএমএফ।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও নানান সংকটে গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি। নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আদায় বাড়াতে নিরলস কাজ করছে এনবিআর, রাজস্ব বাড়াতে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক তিন বিভাগের টাস্কফোর্স ও কাজ করছে। এসব বিষয় আইএমএফকে জানানো হয়েছে। 


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরবর্তী বৈঠকে সম্ভাব্য নতুন ঋণচুক্তির অগ্রগতি, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থায়ন এবং সরকারি ব্যয় পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।



আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর জন্য ধাপে ধাপে ৬০ হাজার কোটি টাকার অর্থায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারি মালিকানাধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।


প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের কঠোর অবস্থান এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হলে রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের অপ্রত্যাশিত ব্যয়ের জন্য সংরক্ষিত বরাদ্দ থেকে ধাপে ধাপে নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

Previous Post Next Post

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন