চামড়া যাচ্ছে পানির দরে, হাজার কোটি টাকা কামাচ্ছে অন্য দেশ

 


পবিত্র ঈদুল আজহা এলেই দেশের চামড়ার বাজার নতুন করে আলোচনায় আসে। সরকার দাম নির্ধারণ করে, ব্যাংক ঋণ দেয়, ট্যানারি মালিকরা বড় সংগ্রহের ঘোষণা দেন, আর মাদ্রাসা-এতিমখানা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আশায় থাকেন ন্যায্য মূল্য পাওয়ার। কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর ধরে কাঁচা চামড়ার বাজারে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে— দরপতন, অব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর হতাশা।

একসময় কোরবানির পশুর চামড়া ছিল মাদ্রাসা ও এতিমখানার অন্যতম বড় আয়ের উৎস। এখন সেই চামড়াই অনেক জায়গায় বিক্রি হচ্ছে খুবই কম দামে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে না পারা, সিন্ডিকেট, নীতিগত দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প ধীরে ধীরে সংকটে পড়ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে কম দামে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া কিনে চীনসহ বিভিন্ন দেশ তা প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ববাজারে বিপুল মুনাফা করছে।

এবার ট্যানারি মালিকরা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছেন। রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ চামড়া সরাসরি কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। চামড়া কেনার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় এ অর্থ অনেক কম।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগের ঋণ খেলাপির কারণে অনেক ট্যানারি নতুন ঋণ পাচ্ছে না। ফলে বাজারে নগদ অর্থের সংকট থেকেই যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক কিছু প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিলেও তা পুরো খাতের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।

চামড়ার বাজারে সবচেয়ে বড় সংকট এখন মূল্য পতন। ২০১৫ সালে একটি গরুর চামড়া গড়ে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে অনেক এলাকায় তা ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় নেমে এসেছে। অথচ মূল্যস্ফীতির হিসাব অনুযায়ী সেই দাম এখন আরও বেশি হওয়ার কথা ছিল।

সরকার এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি প্রতি পিস চামড়ার সর্বনিম্ন মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে সেই দাম বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চামড়ার দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর করা হলেও সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে পরিবেশদূষণের কারণে আন্তর্জাতিক মানের এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না অধিকাংশ ট্যানারি।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৫৫ থেকে ১৬০টি ট্যানারি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি। এই সনদ না থাকায় ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে বাংলাদেশ কম দামে আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিদেশে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

চামড়ার মান কমে যাওয়ার পেছনেও রয়েছে নানা কারণ। লাম্পি স্কিন ডিজিজে আক্রান্ত গরু, অদক্ষ কসাই দিয়ে জবাই, সঠিকভাবে লবণ ব্যবহার না করা, বৃষ্টিতে চামড়া নষ্ট হওয়া এবং সংরক্ষণে অবহেলার কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২১ শতাংশ চামড়ায় কাটাছেঁড়া বা ক্ষত তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি দাম কমিয়ে দিচ্ছে।

এবার সরকার চামড়া খাত সচল রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ আংশিক উন্মুক্ত করা, জেলা পর্যায়ে মনিটরিং, কসাই প্রশিক্ষণ, কন্ট্রোল রুম চালু এবং মাদ্রাসা-এতিমখানায় লবণ সরবরাহ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ হাজারের বেশি পেশাদার এবং প্রায় ২৩ হাজার অপেশাদার কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাভারের বর্জ্য শোধনাগারের দ্রুত উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাজারে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা তৈরি করা না গেলে দেশের চামড়াশিল্প আরও বড় সংকটে পড়বে।

তাদের মতে, চামড়াশিল্প শুধু মৌসুমি ব্যবসা নয়, এটি লাখো মানুষের জীবিকা এবং বাংলাদেশের বড় একটি রফতানি সম্ভাবনার খাত। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এই খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। 

Previous Post Next Post

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন