যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরান অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় বিশ্বনেতারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সেই প্রলয়ঙ্করী হুমকি থেকে সরে এসেছেন। তিনি যুদ্ধ আরও তীব্রতর করার হুমকি দিয়েছিলেন; অথচ এ যুদ্ধ এরই মধ্যে একাধিক বৈশ্বিক সংকট তৈরি করেছে।
তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় স্বস্তি এলেও বিশ্বনেতাদের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ছয় সপ্তাহ ধরে বেশির ভাগ দেশ ট্রাম্পকে এমন এক যুদ্ধ চালাতে দেখেছে, যা তাদের অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ঝাঁকুনি দিয়েছে। অথচ অসহায়ভাবে এসব দেখা ছাড়া তারা তেমন কিছু করতে পারেনি।
দুই সপ্তাহের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইউরোপীয় নেতাদের অনেক ফাটল মেরামত করতে হবে; এ যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিবেশে যেসব ফাটল তৈরি করেছে।
দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্প যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করেছেন, সেখানে কীভাবে খাপ খাইয়ে চলতে হবে, তা-ও তাঁদের খুঁজে বের করতে হবে। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ট্রাম্প তাঁর মিত্র ও শত্রু—উভয় পক্ষকে সমানভাবে অনিশ্চয়তা ও দোটানায় ফেলে দিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ডে অন্যান্য দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করলেও নিজেদের সুরক্ষিত রাখাতে তারা তেমন কোনো পথ খুঁজে পায়নি।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আজকের পৃথিবী কি গতকালের চেয়ে ভালো? নিঃসন্দেহে।’ এরপর তিনি যুক্ত করেন, আজকের পৃথিবী ‘৪০ দিন আগের চেয়ে কি ভালো? সে বিষয়ে কিন্তু যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’
ইরান যুদ্ধের ঘোরবিরোধী স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি ভালো খবর, বিশেষ করে তা যদি ন্যায়সংগত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে নিয়ে যায়।’ তবে তিনি যথারীতি ট্রাম্পের সামরিক অভিযানের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
সানচেজ লিখেছেন, ‘এই সাময়িক স্বস্তি আমাদের যেন বিশৃঙ্খলা, ধ্বংস আর হারানো প্রাণের কথা ভুলিয়ে না দেয়।...কেউ পৃথিবীতে আগুন লাগিয়ে, পরে এক বালতি পানি নিয়ে হাজির হলেই স্পেন সরকার তার প্রশংসা করবে না। এখন কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি একান্ত দরকার।’
ইউরোপের বাইরে ওমান, জাপান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশ যুদ্ধবিরতির খবরকে স্বাগত জানিয়েছে।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। ৮ এপ্রিল ২০২৬
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর ইরানের রাজধানী তেহরানের একটি সড়কে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। ৮ এপ্রিল ২০২৬ছবি: রয়টার্স
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ স্কাই নিউজকে বলেন, তিনি এ চুক্তিকে স্বাগত জানান এবং যুদ্ধের শেষ চান। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘এ যুদ্ধ অস্ট্রেলিয়া ও আমাদের অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।’
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘চুক্তি না হলে ইরানে আজ রাতে একটি সভ্যতার মৃত্যু হবে।’ আলবানিজ ট্রাম্পের এ হুমকির সমালোচনা করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।’
অন্যান্য বিশ্বনেতা এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে যে অস্থিরতার তৈরি হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। এ সংকটের ফলে জ্বালানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে ও দাম বেড়েছে। অনেক সরকারকে গাড়িচালক ও অন্যান্য ভোক্তার চাপ কমাতে ব্যয়বহুল পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি প্রায় বন্ধ করে দেয় ইরান। প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হলে এ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে তেহরান।
জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এখন আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করা প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।...আলোচনার মাধ্যমে ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট ঠেকানো যেতে পারে।’
বিশ্বনেতাদের হতাশার জায়গা হলো—এই যুদ্ধ বা অন্য কোনো সংঘাতের বিষয়ে ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা তাঁদের হাতে তেমন একটা নেই। তাঁর আক্রমণাত্মক ও প্রায় সময় বদলে যাওয়া বক্তব্যের অর্থ বুঝতে এক মাস ধরে বিশ্বনেতাদের হিমশিম খেতে হয়েছে।
ট্রাম্পের একেক সময়ের একেক মন্তব্যের পর বিশ্বনেতাদের কেউ কেউ মৃদু সমর্থন দিয়েছেন, কেউ পরিমিত প্রতিবাদ করেছেন। আবার ট্রাম্প নিজে থেকে মত বদলাবেন, এ আশায় কোনো কোনো বিশ্বনেতা চুপ থেকেছেন।
উদাহরণ হিসেবে গত মঙ্গলবারের কথাই ধরা যায়। সেদিন ট্রাম্প সেই ‘প্রলয়ঙ্করী হুমকি’টা দেন। বলেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সভ্যতার মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেবে; কিন্তু জার্মানির চ্যান্সেলর মের্ৎস, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার কিংবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, কেউ–ই প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এ বক্তব্যের সমালোচনা করেননি।
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের ডানে একটু পেছনে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের জেমস এস. ব্র্যাডি প্রেস ব্রিফিং রুমে। ৬ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের ডানে একটু পেছনে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের জেমস এস. ব্র্যাডি প্রেস ব্রিফিং রুমে। ৬ এপ্রিল ২০২৬ছবি: রয়টার্স
এসব নেতা সম্ভবত ইচ্ছা করেই নীরব ছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন আরও উত্তেজিত হয়ে না পড়েন, এ জন্যই তাঁরা হয়তো চুপ ছিলেন; আর এ সময়টিতে পাকিস্তানের নেতৃত্বে কূটনীতিকেরা যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। একই সময়ে মাখোঁ ও মের্ৎস এক্সে ইরান যুদ্ধের প্রসঙ্গ এড়িয়ে অন্য বিষয় নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর চেষ্টায় গত এক মাস ব্যস্ত ছিলেন।
ইতালির শিক্ষকদের একটি সংগঠনের প্রধান সতর্ক করে সম্প্রতি বলেন, ‘জ্বালানির ঘাটতি চলতে থাকলে স্কুল খোলা রাখা কঠিন হতে পারে। এতে শিক্ষার্থীদের (চলতি সেমিস্টারের) শেষ কয়েক সপ্তাহ হয়তো অনলাইনে ক্লাস করতে হবে।’
জ্বালানিসংকট ব্যক্তিগতভাবে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে হাজির হয়েছে। কারণ, বিচারব্যবস্থা সংস্কারসংক্রান্ত গণভোটে তিনি পরাজিত হয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের কিছুটা স্বস্তি দিতে মেলোনির সরকার অন্তত মে মাসের শেষ পর্যন্ত জ্বালানির ওপর কর কমিয়েছে। স্পেনও জ্বালানির কর কমিয়েছে। জার্মানিতে গ্যাস স্টেশনগুলোকে দিনে মাত্র একবার মূল্য বৃদ্ধি করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ভোক্তাদের সহায়তা করতে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জার্মানিতে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন গতকাল জানিয়েছে, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি সাধারণ পরিবারের জ্বালানি ব্যয় প্রায় ২ হাজার ইউরো (প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার টাকা) পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
তবে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অগ্রগতি হলেও জনগণকে স্বস্তি দিতে বিভিন্ন দেশের সরকারকে আরও পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতালির মিলানের বক্কোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক টিটো বোয়েরি বলেন, ‘এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।...তাই হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও এসব দেশের পুরো সক্ষমতায় ফিরতে সময় লাগবে।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের গতকালই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে সফর শুরু করার কথা। সফরে তিনি মিত্রদের সঙ্গে দেখা করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য কীভাবে স্থায়ীভাবে খোলা রাখা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করবেন। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগেই স্টারমারের এ সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের উদ্যোগে ৪০টির বেশি দেশের কূটনীতিক ও সামরিক পরিকল্পনাবিদেরা প্রণালিটি কীভাবে আবার খোলা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে সেই আলোচনা থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কোনো কর্মপরিকল্পনা আসেনি।
